"ছেলেবেলা কখন শেষ হয়? অন্যদের কথা জানি না, আমার মনে আছে যেদিন ম্যাট্রিক পরীক্ষার শেষ পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে এসে টেবিলের উপর থেকে মেক্যানিকসের বইটা তুলে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, ঠিক সেই মুহুর্তেই মনে হয়েছিল আমি আর ছোট নেই, এর পর কলেজ, এখন থেকে আমি বড় হয়ে গেছি...." - This is so, so true.... সত্যজিৎ রায়ের 'যখন ছোট ছিলাম' পড়েছি অনেক বড়ো বয়সেই - পড়ে মনে হয়েছিলো এই বই আমার অনেক আগেই পড়া উচিত ছিলো। মধ্যবিত্ত বাঙালি সংসারে জমে ওঠা বহু সমস্যার মধ্যে অন্যতম সমস্যা হলো 'সঠিক গাইডেন্স' - সে যে বিষয়ই হোক না কেন।
পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের লেখার বিশাল একটা গুণ ছিলো বইয়ের অক্ষরের মধ্যে দিয়ে, পাঠকের চোখের সামনে গল্পের ঘটনার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পর্যন্ত তুলে ধরা। সেজন্যেই 'সোনার কেল্লা' ছায়াছবি দেখে যত মুগ্ধ হয়েছি, 'সোনার কেল্লা' বই পড়েও একইভাবে মুগ্ধ হয়ে থেকেছি - শুধু দু-একবার নয় - বারে বারেই।
![]() |
| আমার ইস্কুল - Harinavi D.V. A. S. High School |
'ইস্কুল' আর 'স্কুল' - এই দুই শব্দের মূল অর্থ একদম একই - তবুও “ইস্কুল” কথাটা মনে আনতেই কোথা থেকে যেন একগাদা স্নেহ ভালবাসা মাথার মধ্যে এসে হাজির হয়ে যায় !! আর তারই হাত ধরে ধরে চলে আসে সেই কাঠের টেবিল-বেঞ্চে একসাথে বসে থাকা, ক্লাস শেষে 'ঢং ঢং' করে বেজে যাওয়া ঘন্টার আওয়াজ, টিফিন টাইমে আইসক্রিম-ওয়ালার হাঁক-ডাক, বড়ো বড়ো পাল্লাওয়ালা কাঠের জানালায় বর্ষায় বৃষ্টির ছাঁট, শীতের দুপুরের টাটকা রোদ, ক্লাস শুরুর ঘন্টা-বাজা কে কাঁচকলা দেখিয়ে মাঠে খেলতেই থেকে যাওয়া, সদ্য আবিষ্কৃত প্রেমিকার আঙুলের ডগায় গোপন নিষ্পাপ ছোঁয়া..... ..... ..... তাই এই বইয়ের একদম শেষে যখন তিনি বলেন: "এর পরে আর স্কুলে ফিরে যাইনি কখনো। এটাও জানি যে যে-সব জায়গার সঙ্গে ছেলেবেলার স্মৃতি জড়িয়ে থাকে, সে সব জায়গায় নতুন করে গেলে পুরনো মজাগুলো আর ফিরে পাওয়া যায় না। আসল মজা হলো স্মৃতির ভান্ডার হাতড়ে সেগুলোকে ফিরে পেতে..." - তখন মনে হয়, আরে !! এতো একদম আমার নিজের মনেরই কথা !!
শেষবারে আমিও, স্কুলের সামনে গিয়েও ঢুকতে পারিনি - কিছুক্ষণ সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে, একটু ঘোরা-ফেরা করে ফিরে এসেছি !!! আসলে আমাদের সবার মনেতেই কিছু-না-কিছু ভাবনা-চিন্তা, বা আবেগ-অনুভুতিগুলো একই সুরে বাজে - সত্যিকারের ভালো লেখকেরাই একমাত্র পারেন সেগুলোকে যথার্থ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে.....
স্মৃতির রহস্যই হলো অনেক তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়গুলোকে সারাজীবন মনে গেঁথে রাখা - আবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে একেবারে বেমালুম লোপাট করে দেওয়া। সত্যজিৎ রায়ের লেখা স্মৃতিকথা প্রথম বার হয়েছিলো 'সন্দেশ' মাসিক পত্রিকার দুই সংখ্যায়। এর অনেক পরে ১৯৮২ সালে সেইসব লেখাগুলো ও আরো কিছু ঘটনার লেখা একত্রিত করে আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই 'যখন ছোট ছিলাম'...

