"পথে নিম গাছ ,
নীচের পুকুরে
সবুজ জলের নীচে
সাদা পুঁটি মাছ -
ঘুরে ঘুরে
জলে ঝরে পড়ে সাদা ফুল.....
...বহুদিন চিঠি নেই, পত্র নেই
প্রানের অতুল....."
(তারাপদ রায়)
ছোট থেকে ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে যাবার সময় আমাদের শরীর-মন, পছন্দ-অপছন্দের সাথে সাথে ভালো ও মন্দের ডেফিনিশানটাও বদলে যেতে থাকে - আরও সত্যি করে বলতে গেলে 'ঘুলিয়ে' যেতে থাকে। একসময় যেগুলোকে খারাপ, বিরক্তিকর বলে মনে হতো, সেগুলোকেই এখন ভাবলে মনে হয় কি দারুণই না ছিলো !! বাবার মুখে শুনতাম যুদ্ধের বাজারে ব্ল্যাক আউটের কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিলো। সূর্যাস্তের পর বাড়িতে আলো জ্বালানোর হুকুম ছিলো না - মিলিটারিরা অন্ধকার রাস্তায় টহল দিয়ে বেড়াতো - ধরা পড়লেই আর রক্ষা থাকতো না। শুনে সেই সময় ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেলেও, এখন মনে হয় ব্যাপারটার মধ্যে একটা অন্য রকমের থ্রীলও লুকিয়ে ছিলো। 'জীবনের সেরা সময়টা' কি সেটা জানতে চাইলে এখন মনে হয়, যে সময়গুলোতে আমার কঠিন সব অসুখ হতো, সেগুলোই ছিলো জীবনের পরম সুখের সময়। ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই পিসিমা এক কাঁচের গ্লাস করে মৌরী-মিছরি ভেজানো জল এনে মুখের সামনে ধরতেন, জ্বর মুখে দুর্বল শরীরে খেতে তা যে কি ভালো লাগতো তা বলে বোঝানো অসম্ভব! অভাবের সংসারেও বাবা বাজার থেকে সকালবেলায় চারটে নরম সন্দেশওয়ালা একটা ছোট্ট মিষ্টির বাক্স এনে মায়ের হাতে তুলে দিতেন। দিনের বেলায় মশারি টাঙিয়ে নিজের পছন্দমতো এক গাদা গল্পের বই নিয়ে সারাটা দিন শুয়ে, আধশুয়ে পড়ে চলতাম - কেউ কিচ্ছুটিও বলতো না! সেই সব সোনার দিন আর নেই - বাবা আর পিসিমাও বহুদিন হলো পরপারে চলে গিয়েছেন। এখন যদি কেউ মন্ত্রবলে সেই সময়কার দিনগুলোতে আমাকে ফেলে দিয়ে আসে তা'হলে যে একচুলও মন খারাপ হবে না, সে'কথা আমি কিন্তু দিব্যি দিয়ে বলতে পারি।

যাই হোক মন খারাপের কথা ভুলে থাকার জন্যে এবারের সপ্তাহের পোস্টে রইলো বগলামামার আরেকখানি হাসির অ্যাডভেঞ্চার, "মধ্যমণি"। এই গল্পের পটভূমিকাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার। আকারে এই গল্পটি বগলামামার অন্যান্য গল্পদের থেকে একটু ছোটো। দারুণ দমফাটা হাসির গল্প না'হলেও এটি কিন্তু যথেষ্টই মজাদার - অন্তত: বর্তমান কালের কাতুকুতু দিয়ে জোর করে হাসানো গল্পদের তুলনায় এটি ঢের, ঢের বেশী মজাদার। গল্পটির ছবিগুলি এঁকেছিলেন প্রয়াত শৈল্য চক্রবর্তী মহাশয়।
~ ~ ~ ~ ~
আজ থেকে প্রায় ৪৮ বছর আগে, ১৩৭৪ সালের (1968) পুজোর সময় দেব সাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো "বেণুবীণা" পূজাবার্ষিকীটি। অন্যান্য বছরের পূজাবার্ষিকীদের তুলনায় এই বইটির কভার-পেজ হিসাবে ছিলো দুটি চোখ জুড়ানো প্রচ্ছদ। এখনকার দিনের যেকোনও পূজাবার্ষিকীকে এর পাশে রাখলে হতাশায় হাসি আসতে বাধ্য! অসাধারন কিছু অলঙ্করণ, অসাধারন একগুচ্ছ বিভিন্ন স্বাদের গল্প এবং দুইটি চিত্রকাহিনীতে জমজমাট ছিলো এই পূজাবার্ষিকীটি।
 |
| দেব সাহিত্য কুটীরের 'বেণুবীণা' পূজাবার্ষিকী (১৩৭৪) |
বইটির আদি সংস্করণটি পোকার কামড়ে কিছুটা বিধ্বস্ত, তাই নতুন করে বইটির রি-প্রিন্ট ভার্সন কিনতে হয়েছে। দুটি বইয়ের দামের মধ্যে তেমন কিছু ফারাক না-থাকলেও পাতার কোয়ালিটি, ছবির রং ও গুণগত মানের আকাশ-পাতাল তারতম্য রয়ে গেছে। কোয়ালিটি আর কোয়ান্টিটির মধ্যেকার স্থূল তফাৎটা আমাদের দেশের প্রকাশকেরা আজও অবধি বুঝে উঠতে পারলেন না !!
বগলামামার গল্পের সাথে ফাউ হিসাবে রইলো আরও দুটি গল্প। প্রথমটি হলো শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা হাসির গল্প, "রাম ডাক্তারের ব্যায়রাম !"
গল্পটি পড়লেই ঝট করে মনে চলে আসে 'ধন্যি মেয়ে (1971)' ছায়াছবির সেই ক্ষণজন্মা ডাক্তার পাকড়াশীর কথা, যিনি কালীবাবুর (ওরফে উত্তমকুমার) স্ত্রীর চিকিৎসা করতে এসে হাতুড়ি, স্ক্রু-ড্রাইভার, শাবল, করাত ইত্যাদির খোঁজ করতে শুরু করে দিয়েছিলেন।
 |
| ধন্যি মেয়ে ছায়াছবিতে কালীবাবু ও ডাক্তার পাকড়াশী |
'ধন্যি মেয়ে' ছায়াছবির রিলিজ হওয়ার বেশ কয়েকবছর আগেই 'বেণুবীণা' পূজাবার্ষিকীটি প্রকাশিত হয়েছিলো। তাই শিবরাম চক্রবর্তীর এই গল্পটিই যে ওই ছায়াছবির ডাক্তার পাকড়াশীকে প্রভাবিত করেছিলো, সে আশঙ্কা নেহাৎ অমুলক নয়।
আর দ্বিতীয় গল্পটি হলো শ্রদ্ধেয় হরিনারায়ান চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি গা ছমছম করা ভূতের গল্প: "পাঁচ মুন্ডীর আসর"। গল্পের বিষয়বস্তু বা পটভূমিকার মধ্যে আহামরি কিছু নেই, কিন্তু রচনা শৈলীর কল্যাণেই পড়তে ভীষণ ভালো লাগে। শৈশবে পড়া সেই গল্প এই মধ্য যৌবনে এসে, আবার করে পড়ে ঠিক আগের মতোই শিহরিত হয়ে উঠলাম।
আশা করি এই তিনটি গল্পই সবার খুব ভালো লাগবে। ভালো-মন্দ বেশ কিছু কমেন্টস পেলে হয়তো বগলামামার বাকি কয়টি কাহিনীও ধরা দেবে এই ব্লগে।
 |
মধ্যমণি ও অন্যান্য
(Size: 14.1 MB) |